১১:৩০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ২ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ক্ষমতার দাপটে শিক্ষককে মারধর: চৌদ্দগ্রামের মাদ্রাসা সুপারের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক অভিযোগ

কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার শিলরী হোসাইনিয়া দাখিল মাদ্রাসায় ঘটে গেছে চাঞ্চল্যকর এক ঘটনা। বৃষ্টির কারণে অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা বন্ধ না করায় সহকারী সুপার মাওলানা হাফেজ আহমেদকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেছে মাদ্রাসার সুপার আকবর হোসেন। শুধু মারধর করাই নয়, ঘটনার পেছনে রয়েছে সুপারের ছোট ভাই নুরুল আফসার মোল্লার প্রভাব বিস্তার ও ক্ষমতার অপব্যবহারের গুরুতর অভিযোগ।

ঘটনার পেছনের ঘটনা:

মঙ্গলবার (৮ জুলাই) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে আকস্মিক বৃষ্টির কারণে সুপার আকবর হোসেন সহকারী সুপার হাফেজ আহমেদকে ফোনে পরীক্ষাটি বন্ধ রাখতে বলেন। কিন্তু হাফেজ আহমেদ জানান, ২০০ পরীক্ষার্থীর মধ্যে ১৫৮ জন উপস্থিত থাকায় পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়া যুক্তিযুক্ত। পরবর্তীতে বিষয়টি তিনি মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির সভাপতির সঙ্গে আলোচনা করে পরীক্ষা চালিয়ে যান। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে সকাল সাড়ে ১১টার দিকে সুপার আকবর হোসেন মাদ্রাসায় উপস্থিত হয়ে হাফেজ আহমেদের সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে পড়েন এবং এক পর্যায়ে কিলঘুষি মেরে তাকে আহত করেন।

আহত হাফেজ আহমেদ বর্তমানে বিশ্রামে আছেন এবং থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন বলে জানা গেছে।

অতীতের বিতর্কিত ইতিহাস:

এটাই প্রথম নয়। ২০২৩ সালের মে মাসে সুপার আকবর হোসেন সহকারী সুপার হাফেজ আহমেদকে হুমকি দিয়ে মাদ্রাসায় না আসার নির্দেশ দেন। এরপর ২০২৪ সালের ৫ জুলাই একই ধরনের হুমকি ও অপমানজনক আচরণ করেন তিনি। অভিযোগ রয়েছে, মাদ্রাসার অর্থ লেনদেনের স্বচ্ছতা বজায় রাখার উদ্দেশ্যে সহ-সুপার যখন কালেকশনকৃত টাকা ব্যাংকে জমা দেন, তখন থেকেই আকবর হোসেন তার বিরুদ্ধে বৈরী আচরণ শুরু করেন।

একাধিক সূত্রে জানা যায়, আকবর হোসেন পূর্বেও এক সহকারী সুপারকে মারধর করে মাদ্রাসা থেকে বের করে দেন।

ছোট ভাইয়ের ছায়া প্রভাব:

সুপার আকবর হোসেনের এই দম্ভ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অন্যতম কারণ বলা হচ্ছে তার ছোট ভাই নুরুল আফসার মোল্লার প্রভাবকে। তিনি বর্তমানে “বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির ভাইস চেয়ারম্যান” পদে থাকলেও জামাত শিবির সংশ্লিষ্টতায় সক্রিয় বলে এলাকাবাসীর অভিযোগ। তাহের হারুনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হওয়ায় রাজনীতির আড়ালে মাদ্রাসা ও মসজিদ নিয়ন্ত্রণ, এমনকি সামাজিক শৃঙ্খলা ভেঙে দেওয়ার মতো কাজেও যুক্ত আছেন বলে জানা যায়।

স্থানীয়রা জানান, নুরুল আফসার কুলাসার মাদ্রাসার দায়িত্বও পালন করছেন এবং সেখানে একইভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার করছেন। সম্প্রতি তার বিরুদ্ধে সমাজে গালমন্দ, ভীতি প্রদর্শন, মিথ্যা অপবাদ ছড়ানো এবং জায়গা-জমি দখলেরও অভিযোগ উঠেছে।

এলাকাবাসীর উদ্বেগ:

চৌদ্দগ্রামের সাধারণ মানুষ এ ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক স্থানীয় ব্যক্তি বলেন, “আকবর হোসেন ও তার ভাই মিলে এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি করেছে। মসজিদ, মাদ্রাসা, এমনকি সামাজিক সংগঠনগুলো পর্যন্ত তারা নিজেদের কবজায় নিচ্ছে। কেউ প্রতিবাদ করলেই হুমকি দেয়, অপমান করে বা মারধর করে।”

তারা আরও বলেন, “৫ আগস্টের পর থেকেই আকবর হোসেনের আচরণ অশালীন হয়ে উঠেছে। আর তার ভাই ইউনিয়নের রাজনীতিতে বিশৃঙ্খলা তৈরি করছে।”

শিক্ষক সমাজে ক্ষোভ:

এই ঘটনার পর শিক্ষক সমাজের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকেই বলেন, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একজন সহকর্মী শিক্ষককে এভাবে লাঞ্ছিত করা শুধু অনৈতিকই নয়, বরং আইনগতভাবে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। একজন সুপার যদি এভাবে সহকর্মীকে মারধর করতে পারেন, তাহলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ কেমন হতে পারে, তা সহজেই অনুমানযোগ্য।

তদন্ত ও ব্যবস্থা দাবি:

এখন এলাকাবাসী, শিক্ষক সমাজ এবং সংশ্লিষ্ট মহল এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে যথাযথ শাস্তির দাবি জানাচ্ছেন। তাদের মতে, যদি দ্রুত ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে আগামী নির্বাচনে এই প্রভাবশালী চক্র সমাজে আরও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে।

একজন অভিভাবক বলেন, “আমরা সন্তানদের নিরাপদ ও নৈতিক শিক্ষার জন্য মাদ্রাসায় পাঠাই, কিন্তু যেখানে শিক্ষকদেরই মারধর করা হয়, সেখানে শিক্ষার্থীরা কী শিখবে?”

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী নিজ নিজ অবস্থানে অনড়, ভোটের মাঠে স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও রয়েছে শক্ত অবস্থানে

ক্ষমতার দাপটে শিক্ষককে মারধর: চৌদ্দগ্রামের মাদ্রাসা সুপারের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক অভিযোগ

Update Time : ১২:৫৫:০৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৯ জুলাই ২০২৫

কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার শিলরী হোসাইনিয়া দাখিল মাদ্রাসায় ঘটে গেছে চাঞ্চল্যকর এক ঘটনা। বৃষ্টির কারণে অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা বন্ধ না করায় সহকারী সুপার মাওলানা হাফেজ আহমেদকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেছে মাদ্রাসার সুপার আকবর হোসেন। শুধু মারধর করাই নয়, ঘটনার পেছনে রয়েছে সুপারের ছোট ভাই নুরুল আফসার মোল্লার প্রভাব বিস্তার ও ক্ষমতার অপব্যবহারের গুরুতর অভিযোগ।

ঘটনার পেছনের ঘটনা:

মঙ্গলবার (৮ জুলাই) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে আকস্মিক বৃষ্টির কারণে সুপার আকবর হোসেন সহকারী সুপার হাফেজ আহমেদকে ফোনে পরীক্ষাটি বন্ধ রাখতে বলেন। কিন্তু হাফেজ আহমেদ জানান, ২০০ পরীক্ষার্থীর মধ্যে ১৫৮ জন উপস্থিত থাকায় পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়া যুক্তিযুক্ত। পরবর্তীতে বিষয়টি তিনি মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির সভাপতির সঙ্গে আলোচনা করে পরীক্ষা চালিয়ে যান। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে সকাল সাড়ে ১১টার দিকে সুপার আকবর হোসেন মাদ্রাসায় উপস্থিত হয়ে হাফেজ আহমেদের সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে পড়েন এবং এক পর্যায়ে কিলঘুষি মেরে তাকে আহত করেন।

আহত হাফেজ আহমেদ বর্তমানে বিশ্রামে আছেন এবং থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন বলে জানা গেছে।

অতীতের বিতর্কিত ইতিহাস:

এটাই প্রথম নয়। ২০২৩ সালের মে মাসে সুপার আকবর হোসেন সহকারী সুপার হাফেজ আহমেদকে হুমকি দিয়ে মাদ্রাসায় না আসার নির্দেশ দেন। এরপর ২০২৪ সালের ৫ জুলাই একই ধরনের হুমকি ও অপমানজনক আচরণ করেন তিনি। অভিযোগ রয়েছে, মাদ্রাসার অর্থ লেনদেনের স্বচ্ছতা বজায় রাখার উদ্দেশ্যে সহ-সুপার যখন কালেকশনকৃত টাকা ব্যাংকে জমা দেন, তখন থেকেই আকবর হোসেন তার বিরুদ্ধে বৈরী আচরণ শুরু করেন।

একাধিক সূত্রে জানা যায়, আকবর হোসেন পূর্বেও এক সহকারী সুপারকে মারধর করে মাদ্রাসা থেকে বের করে দেন।

ছোট ভাইয়ের ছায়া প্রভাব:

সুপার আকবর হোসেনের এই দম্ভ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অন্যতম কারণ বলা হচ্ছে তার ছোট ভাই নুরুল আফসার মোল্লার প্রভাবকে। তিনি বর্তমানে “বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির ভাইস চেয়ারম্যান” পদে থাকলেও জামাত শিবির সংশ্লিষ্টতায় সক্রিয় বলে এলাকাবাসীর অভিযোগ। তাহের হারুনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হওয়ায় রাজনীতির আড়ালে মাদ্রাসা ও মসজিদ নিয়ন্ত্রণ, এমনকি সামাজিক শৃঙ্খলা ভেঙে দেওয়ার মতো কাজেও যুক্ত আছেন বলে জানা যায়।

স্থানীয়রা জানান, নুরুল আফসার কুলাসার মাদ্রাসার দায়িত্বও পালন করছেন এবং সেখানে একইভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার করছেন। সম্প্রতি তার বিরুদ্ধে সমাজে গালমন্দ, ভীতি প্রদর্শন, মিথ্যা অপবাদ ছড়ানো এবং জায়গা-জমি দখলেরও অভিযোগ উঠেছে।

এলাকাবাসীর উদ্বেগ:

চৌদ্দগ্রামের সাধারণ মানুষ এ ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক স্থানীয় ব্যক্তি বলেন, “আকবর হোসেন ও তার ভাই মিলে এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি করেছে। মসজিদ, মাদ্রাসা, এমনকি সামাজিক সংগঠনগুলো পর্যন্ত তারা নিজেদের কবজায় নিচ্ছে। কেউ প্রতিবাদ করলেই হুমকি দেয়, অপমান করে বা মারধর করে।”

তারা আরও বলেন, “৫ আগস্টের পর থেকেই আকবর হোসেনের আচরণ অশালীন হয়ে উঠেছে। আর তার ভাই ইউনিয়নের রাজনীতিতে বিশৃঙ্খলা তৈরি করছে।”

শিক্ষক সমাজে ক্ষোভ:

এই ঘটনার পর শিক্ষক সমাজের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকেই বলেন, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একজন সহকর্মী শিক্ষককে এভাবে লাঞ্ছিত করা শুধু অনৈতিকই নয়, বরং আইনগতভাবে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। একজন সুপার যদি এভাবে সহকর্মীকে মারধর করতে পারেন, তাহলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ কেমন হতে পারে, তা সহজেই অনুমানযোগ্য।

তদন্ত ও ব্যবস্থা দাবি:

এখন এলাকাবাসী, শিক্ষক সমাজ এবং সংশ্লিষ্ট মহল এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে যথাযথ শাস্তির দাবি জানাচ্ছেন। তাদের মতে, যদি দ্রুত ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে আগামী নির্বাচনে এই প্রভাবশালী চক্র সমাজে আরও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে।

একজন অভিভাবক বলেন, “আমরা সন্তানদের নিরাপদ ও নৈতিক শিক্ষার জন্য মাদ্রাসায় পাঠাই, কিন্তু যেখানে শিক্ষকদেরই মারধর করা হয়, সেখানে শিক্ষার্থীরা কী শিখবে?”